তেলেনাপোতা আবিষ্কার থেকে খন্ডহর: অ্যাডাপটেশনের অনন্য উদাহরণ
গত ৩১শে জুলাই ২০২৫ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে চলচ্চিত্র পাঠ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন প্রাবন্ধিক, চলচ্চিত্র সমালোচক, শিক্ষক এবং লেখক বিধান রিবেরু। পাঠচক্রটি আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ। সেই পাঠচক্রে চলচ্চিত্র এবং সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বিধান রিবেরু। সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ ভালো ছবিতে প্রকাশ করা হলো।
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশ চমৎকার একটি অ্যাডাপটেশন হয়েছে। চার্লস ডিকেন্সের নভেলা ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’ অবলম্বনে উৎসব নির্মিত হয়েছে। গল্প থেকে ছবি নির্মাণের চমৎকার একটি উদাহরণ এটি। একটি বড়দিনকে বাংলাদেশের ছাঁচে ফেলে ঈদের দিনের গল্প বলা হয়েছে।
সাহিত্য অবলম্বনে ছবি করলে নির্মাতাদের একটা সুবিধা হয় যে নতুন করে গল্প ভাবতে হয় না। গল্প লেখাই আছে, সেটাকে শুধু ‘ভিজ্যুয়ালি ট্রান্সলেট’ করতে হয়। তবে এই কাজটি করতে হলে নির্মাতার যথেষ্ট জানাশোনা থাকতে হয়।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের একটি অসাধারণ ছোটগল্প আছে, ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’। কয়েকজন তরুন বন্ধু শহর থেকে দূরে এক জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করছে, এরকম একটা গল্প। পুরো গল্পটা প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছেন ফিউচার টেন্সে, যদি ওই জায়গাটিতে যাই, তবে ভিড় বাসে করে, গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে যেতে হবে। সেখানে গিয়ে দেখব একটি পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি, সেখানে যদি এক রহস্যময়ী চরিত্রের নারীর সাথে দেখা হয়, যামিনী তার নাম, তাহলে এমনটা হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এরকম ভাষায় লেখা। একইসাথে গল্পটা টাইমলেস। কোনো সময়ের উল্লেখ করেননি লেখক। শুধু একটা ভাবনা লিখে গেছেন।

ছোটগল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৩ সালে। সেই গল্প অবলম্বনে নির্মাতা মৃণাল সেন তৈরি করেন ‘খন্ডহর’ ছবিটি। তো ফিউচার টেন্সে লেখা, এই টাইমলেস গল্পটি মৃণাল সেন কিভাবে ভিজ্যুয়ালি ট্রান্সলেট করলেন?
তিনি ছবিটা দেখালেন ফ্ল্যাশব্যাকে। প্রোটাগনিস্ট বানালেন এক ফটোগ্রাফারকে, যে কিনা ছবি তোলার জন্য গ্রামে গিয়েছে। সেখানে এক পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি খুঁজে পায় সে।
সেখানে অন্ধকারে ছাদে উঠে এক নারীকে দেখতে পায় সে। অন্ধকারে টর্চের আলো ফেলে বিশাল বাড়িটিকে দেখতে দেখতে হঠাৎ সে দেখে বাড়ির জানালায় এক নারী দাঁড়িয়ে আছে। আলো পড়তেই সেই নিজেকে আড়াল করে নেয়। যামিনী তার নাম। যেন এক অন্ধকারের ভেতর আরেক অন্ধকারকে হারিয়ে ফেলা।
ছবিতে একটি ক্যালেন্ডার দেখানো হয় কিন্তু সেই ক্যালেন্ডারে কোনো বছরের উল্লেখ নেই, যেমন গল্পে কোনো সময়ের উল্লেখ নেই।
তো এভাবেই গল্পটিকে মৃণাল সেন তার মত করে পর্দায় ভিজ্যুয়ালি ট্রান্সলেট করেছেন। আর সেটা তিনি করেছেন চরিত্র, লোকেশন, ক্যামেরা, লাইট, মিউজিক এর মাধ্যমে।
১৯৮৩ সালে মুক্তি পায় খন্ডহর, যেখানে ফটোগ্রাফারের চরিত্রে অভিনয় করেন নাসিরউদ্দিন শাহ এবং রহস্যময়ী নারী যামিনীর চরিত্রে অভিনয় করেন শাবানা আজমী।
- এই পাঠচক্রের আরও লেখা: কে লিখেছিলেন ব্রেথলেস এর গল্প?

