দেলুপি (২০২৫)
বাংলাদেশের ইন্ডিপেনডেন্ট সিনেমার ইতিহাসে দেলুপি একটা বেঞ্চমার্ক হয়ে থাকবে। ছবিটা অবিশ্বাস্যরকমভাবে বিশ্বাস্য।
বিশ্বাস্য হচ্ছে ঘটনা, বিষয়বস্তু। কাউকেই মনে হয়নি অভিনয় করছেন। সবাই নিজের জীবনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে রয়েছেন।
ছবিটি নির্মাণের প্রক্রিয়া অবিশ্বাস্য। অল্প কয়েকজন মিলে, একটা ক্যামেরা নিয়ে প্রত্যন্ত এক অঞ্চলে বসে যে বাংলা সিনেমা বানানো যায় তা এই ছবির টিম দেখিয়ে দিয়েছে। যা আরও বহু বছর নতুন নির্মাতাদের অনুপ্রেরণা দেবে।
ছবিটা ওটিটিতে রিলিজ দিলে নির্মাতা এবং প্রযোজকের পয়সা সহজে উসুল হতো। তবে সহজ পথে না গিয়ে তিনি বেছে নিলেন কঠিন পথ। মুক্তি দিলেন সিনেমা হলে। তাও ঈদ ছাড়া রেগুলার সময়ে।
এজন্য গোটা টিমকে অভিনন্দন। তারা অবিশ্বাস্য একটা কাজ করে দেখিয়েছে।
দেলুপি ছবির মূলশক্তি এর শক্ত ভিত। লোকাল গল্প, একটি ইউনিয়নের চলমান ঘটনাবলী এর বিষয়বস্তু। রাজনৈতিক স্যাটায়ার থাকলেও সেটা কোনো পক্ষ নেয়নি বরং সব পক্ষকেই কটাক্ষ করেছে। কাউকে ছাড় দেয়নি। ছোট ছোট কমিক রিলিফগুলো হলে খুব আনন্দ দিয়েছে। দর্শক হেসেছে, ছবির সাথে কানেক্ট করেছে। বিশেষ করে পলাশদার চরিত্রটি দর্শকদের বিনোদন দিয়েছে।
এসব ভালো দিকের পাশাপাশি ছবিটির কিছু কমতিও আছে।
ছবিটি বড় পর্দায় দেখে মনে হয়েছে সিনেমা হলে যেরকম লার্জার দ্যান লাইফ অনভূতি দর্শকেরা পায় সেটা এই ছবিতে মিসিং। এটা বরং একটা ডকুমেন্টারির ফিল দিয়েছে, যাপিত জীবনের গল্প বলে গেছে।
কারিগরি দিক থেকে এবং গল্পের গভীরতার দিক থেকেও। স্ক্রিপ্টে আরও কাজ করা যেত। গল্পটা ফ্ল্যাট লেগেছে। আরও মোচড়, বাঁক থাকা দরকার ছিল। পরবর্তীতে কি হবে এরকম কোনো আগ্রহ হয়নি, গল্পটা জাস্ট এগিয়ে গেছে। গল্পের যে টানটান ব্যাপার থাকে সেটা নেই।
জাকির চেয়ারম্যানের চরিত্রটি যথেষ্ট চতুর এবং অভিনেতা সহজাত অভিনয় করেছেন। তবে তার স্ক্রিন উপস্থিতি বাকিদের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। জাকির চেয়ারম্যানের অংশ কমিয়ে মিহির বা পার্থ-নুপূরদের আরও জায়গা দিলে ভালো হতো।
সিনেমা একটি কালেক্টিভ আর্ট ফর্ম। এখানে অনেকে মিলে কাজ করে একটি শিল্প পণ্য তৈরি করেন। তাই যেকোনো সিনেমাতেই বিভিন্ন ধারার, বিভিন্ন কাজের মানুষের সম্মিলন ঘটে। এই ছবিতে সেটা মিসিং। এটা ওয়ান ম্যান শো।
বলতে গেলে নির্মাতা তাওকীর একাই সব করেছেন। তাওকীর গল্প ভেবেছেন, স্ক্রিপ্ট লিখেছেন, ছবি তুলেছেন। তাই এই ছবিতে টেকনিক্যাল বৈচিত্র্য খুব একটা চোখে পড়েনি। ভিন্ন কোনো সিনেমাটোগ্রাফার কাজ করলে এই ছবির ভিজ্যুয়াল ট্রিটমেন্ট আলাদা হতো। তাওকীর একা অনেক বেশি কাজ করে ফেলেছেন যা ছবিটিকে টেকনিক্যালি মনোটোনাস করেছে। অবশ্য ইন্ডিপেনডেন্ট ছবির কৌশলই এমন।
সব মিলিয়ে দেলুপি এই বছরের অন্যতম সেরা বাংলা ছবি যার প্রভাব থেকে যাবে আরও বহু বছর। স্বাধীন নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে দেলুপি।

